অতীশ দীপঙ্কর (পাঠ : ৬)

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - চরিতমালা | NCTB BOOK
649

যুগে যুগে বাংলাদেশে বহু জ্ঞানী পণ্ডিত ও মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁরা নিজ গুণে বিশ্বের ইতিহাসে শ্রদ্ধার আসন লাভ করেছেন। অমর হয়ে আছেন মানুষের মনের মধ্যে। সেই রকম এক মনীষী অতীশ দীপঙ্কর। অতীশ দীপঙ্কর বাংলাদেশের লোক ছিলেন। ৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন ঢাকা জেলার অন্তর্গত বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে তাঁর জন্ম। এটি বর্তমানে ঢাকা বিভাগের মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। অতীশের বাস্তুভিটাটি এখনও বিদ্যমান।

বজ্রযোগিনীর সেই ঐতিহাসিক স্থানটিতে অতীশ দীপঙ্করের নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটি করেছে 'বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ' নামক একটি সংগঠন। চীনসহ অনেক দেশ থেকে অনেক লোক এই বাস্তুভিটাটি দেখতে আসেন।
অতীশের পিতার নাম ছিল কল্যাণশ্রী। মাতার নাম প্রভাবতী। জন্মের পর মা-বাবা আদর করে তাঁর নাম রাখেন চন্দ্রগর্ভ। তাঁদের পরিবার ছিল অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী। বজ্রযোগিনী গ্রামে এখনও তাঁর বসতভিটার চিহ্ন রয়েছে। সেখানকার লোকেরা সেই স্থানটিকে বলেন নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা। চন্দ্রগর্ভ শৈশবকাল থেকেই খুবই মেধাবী ছিলেন। জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। খুব অল্প সময়েই তিনি সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্র এবং কারিগরি বিদ্যায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য চলে গেলেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি কঠোর অধ্যবসায়গুণে নানা শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করেন। চন্দ্রগর্ভ ঊনত্রিশ বছর বয়সে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তখন তাঁর নতুন নাম হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। একত্রিশ বছর বয়সে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সুবর্ণ দ্বীপে যান। তাঁর সঙ্গে ছিল শতাধিক শিষ্য। সেখানে তিনি দীর্ঘ বার বছর বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন।
তারপর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান দেশে ফিরে আসেন। তখন বাংলাদেশের রাজা ছিলেন নয়াপাল। রাজার অনুরোধে তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারের অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যও ছিলেন।
তাঁর পাণ্ডিত্যের কথা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ে তিব্বতে বৌদ্ধধর্মে নানারকম অনাচার প্রবেশ করে। তিব্বতের রাজা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের অগাধ পান্ডিত্যের কথা শুনে তাঁকে তিব্বতে আমন্ত্রণ জানান। রাজার ধারণা ছিল, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে নিয়ে যেতে পারলে সে দেশের মানুষের প্রকৃত ধর্মীয় চেতনার বিকাশ ঘটবে।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান রাজার আমন্ত্রণে প্রথম সাড়া দেননি। কিন্তু পরে তিনি রাজি হন। আনুমানিক ১০৪১ সালে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতের উদ্দেশে রওয়ানা হন।

সে সময় তিব্বতে যাওয়ার পথ সুগম ছিল না। অনেক কষ্টে হিমালয়ের দুর্গম পথ অতিক্রম করে তিনি তিব্বতে প্রবেশ করেন। তিব্বত সীমান্তে অপেক্ষারত রাজপ্রতিনিধিরা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে বিপুল সংবর্ধনা জানান। তিনি তিব্বতের প্রধান প্রধান শহর, নানা গ্রাম ঘুরে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। তাঁর পাণ্ডিত্য ও ব্যবহারে লোকে মুগ্ধ হতো। তিব্বতের লোকেরা তাঁর ধর্মদেশনা শুনে আস্তে আস্তে ফিরে পেল প্রকৃত ধর্মীয় চেতনা। ধর্মে যেসব অনাচার প্রবেশ করেছিল, সেগুলো তারা পরিত্যাগ করল।

বিক্রমশীলা ত্যাগ করার সময় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বলে গিয়েছিলেন তিব্বতে তিনি মাত্র তিন বছর থাকবেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে দেশে আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত তিব্বতেই থেকে গেলেন। তিব্বতের মানুষকে তিনি খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিব্বতিরাও তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতেন এবং ভালোবাসতেন।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতি ভাষায় বহু ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করেন। তা ছাড়া অনেক বই সংস্কৃত থেকে তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। চিকিৎসা ও কারিগরি বিদ্যা সম্পর্কেও তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
তিব্বতের ক্রাথাং বিহারে তাঁকে 'অতীশ' উপাধি প্রদান করা হয়। 'অতীশ' খুব সম্মানজনক উপাধি। ১০৫৪ সালে তিব্বতের এ্যাথাং বিহারে ৭৩ বছর বয়সে এই মহাপণ্ডিত মৃত্যুবরণ করেন। অতীশের দেহভস্ম সেই বিহারে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে সংরক্ষিত আছে। ১৯৭৮ সালে চীন থেকে তাঁর দেহভস্মের কিছু অংশ বাংলাদেশে আনা হয়। ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে এগুলো সংরক্ষিত আছে।

অনুশীলনমূলক কাজ
অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি পরিদর্শনের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করো (দলীয় কাজ

Content added || updated By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...